ডাকটিকিটে কত কি!

এবারকার ডাকটিকিটের গল্প (মার্চ ২০১৫)

বিয়র্ন বর্গ ও ইংগেমার স্টেনমার্ক

বিয়র্ন বর্গ ও ইংগেমার স্টেনমার্ক  প্রতিভাবান বৈজ্ঞানিক, সাহিত্যিক ও সমাজবিদ যাঁরা সুইডেনকে বিশ্বের দরবারে সম্মানের আসনে তুলে ধরেছেন তাঁদের সঙ্গে দুই অসামান্য ক্রীড়াবিদের নাম উল্লেখ করতে হয়। একজন টেনিসের কিংবদন্তি বিয়র্ন বর্গ ও অন্যজন স্কিয়ার ইংগেমার স্টেনমার্ক - সুইডেন এই দুই ক্রীড়াবিদের অবদান স্বীকার করেছে তাদের দুটি ডাকটিকিটে। বর্গের জনপ্রিয়তা যখন সারা বিশ্ব জুড়ে তখন সুইডেনে তাঁর সম্মান কতখানি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বর্গ টানা ছয় বছর ধরে ৪১টি ম্যাচ জেতার অনন্য রেকর্ড সৃষ্টি করে গেছেন। স্কি-ইঙ্গের ক্ষেত্রে স্টেনমার্কের আবির্ভাব হয় তাঁর মাত্র ৫ বছর বয়েসে এবং প্রথম জাতীয় খেতাব পান ৮ বছরের মাথায়।১৯৭৩ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রথম বিশ্বকাপ জয় করেন। তখন তাঁর বয়েস মাত্র ১৭ বছর। জনপ্রিয়তার বিচারে সুইডেনে বর্গ বড় না স্টেনমার্ক - তা বলা মুশকিল। তাই সুইডেনের ডাকবিভাগ কোনও বিতর্কের অবকাশ না রেখে দু'জনকেই ডাকটিকিটে মূর্ত করে বিশ্ববাসীর কাছে হাজির করেছে।

পিটকাইরন দ্বীপ

জন অ্যাডামস নিউজিল্যান্ড ও পানামা থেকে একই দূরত্বে প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে আগ্নেয়গিরির মতন খাড়া খাড়া পর্বত্‍ শ্রেণীতে ভরা একটি ছোট্ট দ্বীপ দাঁড়িয়ে আছে। দ্বীপটির নাম পিটকাইরন । ১৭৬৭ সালে দ্বীপটি বর্হিবিশ্বের নজরে আসে। প্রাচীনকালে পলিনেশীয় উপজাতিরা এই দ্বীপের অধিবাসী ছিল। কিন্তু এরপর অনেকদিন দ্বীপটি জনশূন্য হয়ে পড়ে। ১৭৯০ সালে ফ্লেচার ক্রিশ্চিয়ান নামে এক নাবিক কিছু পিটকাইরন দ্বীপ নৌ-বিদ্রোহীদের নিয়ে এই দ্বীপে পদার্পণ করলে দীপের নির্জনতা ভাঙ্গে। পড়ে সেখানে জন অ্যাডামস নামে মাত্র একজন দ্বীপবাসীকে জীবিত অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায়। এরপর ধীরে ধীরে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। একসময় দ্বীপের সমস্ত অধিবাসী দ্বীপ ত্যাগ করে নিকটবর্তী তাহিতি ও নরফোক দ্বীপে চলে যায়। কিন্তু সেখানেও নানারকম রোগের প্রাদুর্ভাব হওয়ায় তারা পুনরায় পিটকাইরন দ্বীপে ফিরে আসতে বাধ্য হয়। ছোট্ট এই দ্বীপের কিন্তু নিজ্স্ব ডাকটিকিট আছে এবং তাতে দ্বীপের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বেশ ভাল ভাবেই ধরা পড়েছে। এখানে একটি ডাকটিকিটে জন অ্যাডামস এবং তার বাড়িটিকে দেখা যাচ্ছে এবং অন্য ডাকটিকিটে দ্বীপের প্রকৃতির রূপ ফুটে উঠেছে।

এল্যাণ্ড দ্বীপ

এল্যাণ্ড দ্বীপের পতাকা ফিনল্যান্ড-এর দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অবস্থিত একটি দ্বীপপুঞ্জের নাম এল্যাণ্ড (ALAND)। এল্যাণ্ড দ্বীপপুঞ্জটি ৬৫৫৪টি ছোট ছোট দ্বীপ নিয়ে গঠিত এবং প্রত্যেকটি দ্বীপেরই নিজস্ব নাম আছে। ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ তারা সাতটি ডাকটিকিট প্রকাশের মাধ্যমে তাদের নিজস্ব দেশের অস্তিত্ব ঘোষণা করে। এল্যাণ্ড বর্তমানে ফিনল্যানডের একটি স্বয়ংগসাশিত প্রদেশ। স্বায়ত্ত শাসনের অধিকার বলে সমস্ত আইন প্রণয়ন ও নীতি-নির্ধারণের ক্ষেত্রে দ্বীপের অভ্যন্তরীন কর্তৃপক্ষই সর্বেসর্বা। প্রাচীণকাল থেকেই দ্বীপপুঞ্জের অধিবাসীদের জীবন মাছ ধরার সঙ্গে জড়িত। নৌকাই তাদের জীবনধারণের উপায় বাতলে দেয়। আবার নৌকাই তাদের যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যমও বটে। এখানে ছবিতে ডাকটিকিটের নকশায় এল্যাণ্ড প্রদেশের নিজস্ব পতাকাকে জানতে আমাদের সহায়তা করে। পতাকার নকশায় স্ক্যান্ডিনেভিয়ার বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। গাঢ় নীল রঙের জমির উপর হলুদ ফ্রেমওয়ালা একটি লাল ক্রস - এই হল এল্যাণ্ড-এর নিজস্ব পতাকা। এল্যাণ্ড-এর মানচিত্র ও স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চলের অন্যান্য দেশের মধ্যে তার অবস্থান দেখান হয়েছে ওপর একটি ডাকটিকিটে। এল্যাণ্ড সুইডেন ও ফিনল্যান্ড-এর ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এবং অসলো ও কোপেনহাগেন শহর দুটি থেকে এল্যাণ্ড-এর দূরত্ব প্রায় একই।

এভারেস্ট বিজয়

এভারেস্ট সু-উচ্চ পর্বতমালা আদিমকাল থেকে মানুষকে হাতছানি দিয়ে ডেকে আসছে। মানুষ সেই ডাকে সাড়া না দিয়ে পারেনি। এই দুর্গম পর্বত্‍ শ্রেণীকে জয় করার অদম্য ইচ্ছাকে বিশ্ব-ক্রীড়াঙ্গনের একটি দু:সাহসিক, বিপজ্জনক ও কঠিন স্পোর্ট্স রূপে গণ্য করা হয়ে থাকে। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে ইউরোপে পর্ব্তারোহন অভিযান শুরু হয় আল্পস পর্বতকে কেন্দ্র করে। ১৯৫৩ সালের ২৯ মে দিনটি বিশ্বের প্রত্যেক মানুষের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ওইদিন ব্রিটিশ এক্সপিডিশন দলের স্যার এডমন্ড পি হিলারি ও তেনজিং নরগে 29,028 ফুট পৃথিবীর সবথেকে উঁচু শৃঙ্গ "এভারেস্ট" জয় করেন। এর আগে এই শৃঙ্গ জয় করতে এসে বহু অভিযাত্রী নিজেদের প্রানের বিনিময়ে পরাজয় স্বীকার করে গেছেন। এভারেস্ট শৃঙ্গ জয়ের সঙ্গে সঙ্গে ভারত ২টি ডাকটিকিট প্রকাশ করে এই দু:সাহসিক অভিযানকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য। বেগুনি ও বাদামি রঙের এই দুটি ডাকটিকিতে মাউন্ট এভারেস্টের দৃশ্য রূপায়িত হয়েছিল।

সেন্ট জন অ্যাম্বুলেন্স

প্রতীক যদি ঠিক সময়ে উপযুক্ত চিকিত্‍সা করা যায় তাহলে অনেক মারাত্ম্ক ধরনের আহত এবং অসুস্থ ব্যক্তিকেও সারিয়ে তোলা সম্ভব। বিগত একশ ত্রিশ বছর ধরে "সেন্ট জন অ্যাম্বুলেন্স" নামক সেবা-প্রতিষ্ঠানটি এই সত্যিকে প্রমাণ করতে আন্তরিক প্রচেষ্টায় রত। প্রকৃতপক্ষে সেন্ট জন অ্যাম্বুলেন্স নামক এই প্রতিস্থানটির ইতিহাস ৯৩০ বছরের পুরানো। ওই সময় জেরুজালেম শহরে আগত ক্লান্ত ও অসুস্থ ক্রিশ্চিয়ন তীর্থযাত্রীদের সেবা শুশ্রূষার জন্য একটি আস্তানা গড়ে উঠেছিল। ধীরে ধীরে সেই প্রাচীন সেবা প্রতিষ্ঠানটি তার মহত্‍ কাজের জন্য আজ সারা বিশ্ব জুড়ে প্রতিষ্ঠিত। কিভাবে আহত, নিপীড়িত ও দুস্থ ব্যক্তিদের প্রাথমিক চিকিত্‍সা ও সেবার মাধ্যমে নিরাময় করা যায়, তার উপায় উপকরণের পথ বাতলে দেয় এই প্রতিষ্ঠানটি। ১৯৮৩ সালে সেন্ট জন অ্যাম্বুলেন্স-এর ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজীল্যান্ড প্রভৃতি দেশের ডাকবিভাগ একটি করে ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে। সব ডাকটিকিটে এই প্রতিষ্ঠানের প্রাচীন কাজটি, যা আজ সারা বিশ্বে সমধিক প্রচলিত, তা শিল্পীর তুলিতে কোন না কোন ভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সেই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির প্রতীকের সঙ্গেও আমরা পরিচিত হই।

মেরু শিয়াল

মেরু শিয়াল১৯৮৩ সালে সুইডেন এই ডাকটিকিটটি প্রকাশ করে। সুইডেনের পার্বত্যভূমিতে যে সব জীবজন্তুর সাক্ষাত্‍ মেলে তার মধ্যে উত্তরমেরু অঞ্চলের এই শৃগাল অন্যতম। এরা সাদা শিয়াল , মেরু শিয়াল , বা বরফ শিয়াল হিসাবেও পরিচিত । ভাল ঠান্ডা পরিবেশে এরা ভালভাবে বেঁচে থাকতে পারে। এদের শরীরে একটি গভীর পুরু পশম আছে, যা তাদের প্রচণ্ড ঠাণ্ডাতেও বেঁচে থাকতে সাহায্য করে। পায়ের পাতার নিচের অংশে পশম আছে এবং এই বরফ হাঁটতে সাহায্য করে। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এরা নিজেদের পশমও পরিবর্তন করতে পারে - গ্রীষ্মে এটি পাঁশুটে-বাদামী বা গাঢ় বাদামী আর শীতকালে সাদা রঙ ধারণ করে। প্রখর শ্রবণ শক্তির দ্বারা এরা বুঝতে পারে তাদের শিকার বরফের নিচে ঠিক কোথায় অবস্থান করেছে। সুইডেনের ২.১০ ক্রোনার দামের ১টি ডাকটিকিটে এই শৃগালের প্রতিকৃতি মুদ্রিত হয়েছে। এক সমীক্ষায় জানা গেছে যে এই জাতীয় শৃগালের সংখ্যা নাকি ক্রমশ হ্রাস পাছে। তবু এখনো সুইডেনে কমপক্ষে ৫০ থেকে ৫০০টি শৃগালের সন্ধান মেলে। সমীক্ষায় আরও বলা হয়েছে হে ইঁদুর বা ওই জাতীয় জীব যা খেয়ে এদের বাচ্ছারা বেঁচে থাকে সুইডেনে তার অভাবই এই ধরনের শৃগাল বিলুপ্তির অন্যতম কারণ।